

Published on: January 16, 2026Written by: উস্তাজ ইবনে ইসহাক
এক বোন এসেছেন তার সাংসারিক সমস্যা নিয়ে। এর আগে একটা ডিভোর্স হয়েছে। এখন দ্বিতীয় সংসারের অবস্থাও ভালো না। শ্বশুর বাড়ি থাকতে পারে না, শরীর জ্বালাপোড়া। প্রথম কনসাল্টেন্সি ও কাউন্সেলিং-এ কিছু বিষয় বের হয়। কেঁচোর খুঁড়তে গিয়ে সাপ পাব মনে হচ্ছিল। রুকইয়াহ’র পর বললাম, সামনেরবার মা ও পরিবার অন্য সদস্যদের নিয়ে আসবেন।
৫ মাস পর আসলেন। মাকে সাথে নিয়ে। হ্যাংলা পাতলা ৪৫ বছরের একজন মধ্যবয়সী, দেখে মনে হচ্ছে হাসপাতাল থেকে মাত্র ছাড়পত্র নিয়ে হাজির হয়েছেন। মেয়ের অবস্থা জানলাম, চার মাস পুরোপুরি ভালো ছিলেন। গতমাস থেকে ফের অবনতি শুরু হয়।
মায়ের সাথে কথা শুরু করলাম জিজ্ঞাসার মাধ্যমে—
আন্টি, আপনার কী কোন জিনের সমস্যা ছিলো?
—আমার জিনের সমস্যা ছিলো না। কয়েকজন হুজুর জিন আমার সাথে অনেক আগ থেকে দেখা করতেন। নামাজ পড়তে বলতেন। দীনী কাজে উৎসাহিত করতেন। তবে উনারা কোন ক্ষতি করেন নাই কখনো।
অনেকটা থতমত খেয়ে বললাম—
খুব ভালো তো জিনগুলো। ক্ষতি না করে উপকার, তাও আবার নামাজ পড়ায়। তাহাজ্জুদে জাগায়!
পজিটিভ দেখে খুশিতে বলছেন—
উনারা আমাকে দিয়ে মানুষের সাহায্যও করেছেন। তদবির দিয়েছি ১৮ বছর। মানুষের সাহায্য করেছি। অনেকে উপকৃত হয়েছেন।
তাল মিলিয়ে বললাম—
তদবিরের টাকাগুলো তো মসজিদ মাদ্রাসায় দিয়ে দিতে বলত তাই না?
উৎসাহী কণ্ঠে বলছেন—
জি। আমরা কখনো এসবের টাকা খাই নাই। মানুষের উপকার করে গেছি। কিন্তু দুই বছর আগে আমার বাবার বাড়ির মানুষ পাগল বলে এক কবিরাজ দেখায়, ওই লোক আমার জিনগুলো বেঁধে রেখে দিয়েছে। এখন আর তেমন আসে না।
দুঃখ পেয়ে বললাম—
ব্যাপারটা তো ঠিক করলো না। আপনি কী সুন্দর মানুষের উপকার করছিলেন। এই কাজে বাধা দেয়ার কী প্রয়োজন? এখন আপনি কী জিনগুলো ছাড়িয়ে আনতে চাইতেছেন? আমি কিন্তু জিন ছাড়ানোর ব্যাপারে একটু পরিচিত, আপনি বললে চেষ্টা করতে পারি।
চুপচাপ বসে স্বামীর দিকে তাকাচ্ছেন। আরেকবার আমার দিকে। কিছু বলতে চেয়েও বললেন না। আমিও সুন্দরভাবে সিরিয়াস মুডে চলে গেলাম। বললাম, শুনেন! ডিটেইলস তো অনেক কিছুই শোনালে। বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে কাজটা অনেক ভালো। আমরা যেমন রোগী টাকা দিলে নিজেই খেয়েদেয়ে শেষ করে দেই। ব্যক্তিগত সদকার বাইরে পুরো বা অর্ধেক টাকা মাদরাসা মসজিদে দিয়ে দিচ্ছি না, এর চেয়ে তো জিনগুলোই ভালো! মানুষের সাহায্য করছে। তাই না?
তিনি মাথা নাড়িয়ে কথা শুনছেন শান্তভাবে।
বললাম—
আমরা সবকিছু কোরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে দেখতে হবে। ইমাম সাহেব বা অমুক হুজুর কী করল এসব না দেখে বিজ্ঞ মুফতিদের মত ও কোরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। তো আপনার এই কাজের ব্যাপারে কোরআন কী বলে শুনবেন?
সূরা আল-আন’আমের ১২৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيْعًا ۚ يٰمَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُمْ مِّنَ الْاِنْسِ
আর যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে সমবেত করবেন। সেদিন বলবেন, ‘হে জিনের দল, মানুষের অনেককে তোমরা বিভ্রান্ত করেছিলে’
(অর্থাৎ তারা ইচ্ছাকৃত মানুষকে মিথ্যা বুঝাত। বিভ্রান্ত করত। মানুষ সেটাকে সত্য মনে করে নিত)
وَقَالَ اَوْلِيٰٓؤُهُمْ مِّنَ الْاِنْسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَّبَلَغْنَا اَجَلَنَا الَّذِيْۤ اَجَّلْتَ لَنَا
এবং মানুষদের মধ্য থেকে তাদের অভিভাবকরা বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমরা একে অপরের দ্বারা লাভবান হয়েছি এবং আমরা সে সময়ে উপনীত হয়েছি, যা আপনি আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন’।
(মানুষ মন থেকেই বিশ্বাস করবে তারা উপকৃত হয়েছে ও করেছে শিরক ছাড়া। মানুষ মানুষের সাহায্য নেয়ার মতো সাহায্য নিচ্ছে ভাবত। তাই আল্লাহ তায়ালার দরবারে ভালো কিছুর আশায় নিজের যুক্তি পেশ করছে।)
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা দেখুন কতটা কঠোর এই ব্যাপারে। মানুষের উপকার করা ওসব কবিরাজ ও জিন হুজুরদের আল্লাহ তায়ালা ধমক দিয়ে বলছেন—
قَالَ النَّارُ مَثْوٰىكُمْ خٰلِدِيْنَ فِيْهَاۤ اِلَّا مَا شَآءَ اللّٰهُ ؕ اِنَّ رَبَّكَ حَكِيْمٌ عَلِيْمٌ
তিনি বলবেন, ‘আগুন তোমাদের ঠিকানা, তোমরা সেখানে স্থায়ী হবে। তবে আল্লাহ যা চান (তা ভিন্ন)’। নিশ্চয় তোমার রব প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
অর্থাৎ দিনশেষে আপনি উপকার করেও লাভ হবে না। আল্লাহ তায়ালা এর জন্যও পাকড়াও করবেন। এভাবেই জিনরা মানুষকে বিভ্রান্ত করে ধ্বংস করে দেয়।
এছাড়া এসব বিষয়ে হাদিসে আসছে:
من أتى عرافا فسأله عن شيئ فصدقه لم تقبل له صلاة أربعين يوما
“যে ব্যক্তি কোন আররাফের কাছে আসল, তারপর তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলো, অতঃপর আররাফের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হবে না।” (মুসলিম)
আরেক হাদিসে আসছে:
من أتى كاهنا فصدقه بما يقول كفر بما أنزل على محمد
“যে ব্যক্তি কাহিনের কাছে আসলো, অতঃপর কাহিন যা বললো তা সত্য বলে বিশ্বাস করলো, সে মূলত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করলো।”
কাহিন বা আররাফ বাংলায় এসব তুলারাশি হুজুর, জিন হুজুর, গণক এবং জিনের সাহায্যে চিকিৎসা করা ও গায়েবের খবর দেয়া ব্যক্তিকে বোঝানো হয়।
তো কী বুঝলেন এতক্ষণে? কাজটা ঠিক হয়েছে? হুজুর জিন বলতে যা আছে সব ভণ্ডামি বৈ কিছুই নয়, বুঝে আসছে?
আন্টি মাথা নাড়লেন। বললাম—
এভাবে না। খাঁটি মনে তাওবা করতে হবে। ইস্তিগফার করে এসব থেকে ফিরে আসতে হবে। রোগকে রোগ হিসেবে বিচার করতে হবে।
কথাবার্তা শেষ করে রুকইয়াহ করতে বসালাম। জিন আসে মায়ের শরীরে। বলছে—
আমরা তো মুসলমান। কষ্ট দেয়ার কী দরকার? এই শরীরে ক্ষতি করি না। এমনেই থাকি।
বললাম—
তুই আসা-যাওয়ার কারণে এই শরীরে রোগ বাসা বেঁধে বসেছে। হাজারো সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তারপর বুঝালাম সূরা আল-আন’আমের ১২৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কী বলেছেন। সবিশেষ কসম করে বের হলো। আরো কিছুক্ষণ রুকইয়াহ করা হলে মায়ের শরীর অনেক হালকা লাগে। আলহামদুলিল্লাহ।