

এক কবিরাজ মা আসেন তার মেয়ের জি'নের সমস্যা নিয়ে; কেঁচোর খুঁড়তে গিয়ে বের হয় কুমির। মা নিজেই জি'ন আক্রান্ত ৪০+ বছর যাবত। সে জি'ন দিয়েই ১৬ বছর করেছেন ক'বিরাজি। নিজের মেয়ে জি'নে আক্রান্ত হলে তাওবার পর আসেন রুক'ইয়াহ করতে।
মেয়ের বিয়ে হচ্ছিল না। একবার রুক'ইয়াহ করে গেলে বিয়ে হয়। এবার তৃতীয় দফা আসলেন। এতদিন উনার কবিরা'জিসহ সব ভুলগুলো খুলে বলেননি। ভেবছেন, কী হবে এসব জানিয়ে? তাওবা তো করেই নিয়েছেন। কিন্তু সবকিছু যে একই সূত্রে গাঁথা তা তো আর বুঝবেন না তারা। চলুন পুরো ঘটনাটা একটু ধারাবাহিকভাবে শুনি:
মূল মেয়ে পেশেন্টের মা। জি'ন ডাকে রা'জরানী নামে। নানা ছিলেন পরিচিত ক'বিরাজ। আসন ছিলো তার, সেখানে জিকির আজকার করত ও জি'ন ছাড়াতো। বলা যায়, প্রচলিত বিদআতি তাসাউফের চর্চাও করত। ছোট বেলায় বেড়ে উঠা নানার বাড়িতে। পছন্দ করতেন সেখানেই পুরো সময় কাটাতে। পড়াশোনা বন্ধ দিয়ে তাই সেখানে আসনের জায়গাটায় থাকতেন। মনে হতে পারে নানা বাড়ির প্রতি ভালোবাসায় এমনটা? না। ১১ জন সহপাঠী ছিলো তার, যাদের তিনি শৈশবে ও কৌশরে বন্ধু ভেবে এসেছেন। তাদের সাথে খেলাধুলা করতেন। তাদের মানুষ ভাবতেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞান চিকিৎসার ভাষায় হ্যালুসিনেশন হতো তার। বাস্তবতা বুঝে আসে যখন তিনি বিয়ে করেন। সে রাতে জি'ন তাকে নিতে আসে। মানব স্পর্শ থেকে মুক্ত করে পালিয়ে নিয়ে যেতে লাগলে শ্বাশুড়ি হাত ধরে।
“বউ, কই যাও?” জিজ্ঞেস করলে বলেন, “আমার ভাই এসেছে নিয়ে যেতে।” শ্বাশুড়ি বলেন, “ভাই কোথায়?” তিনিও আর খুঁজে পায় না। তখন বুঝতে পারেন এরা মানুষ না। তারপর অনেকবার এমন চেষ্টা করে। স্বামী তার আঁচলের সাথে লুংগী বা গামছা গিঁট দিয়ে বেঁধে রাখে।
আরেকটু কঠিন ঘটনা ঘটে তার বিয়ের এক বছরের মাথায়। ঠিক বিয়ের মাসেই অসুস্থ হয়ে মারা যান বাবা। তারপর তেমন আহামরি সমস্যা দেখা যায় না। সবকিছুতেই তারা তখন ইউজ টু। এরমধ্যে ননদের জি'নের সমস্যা দেখা দিলে তেল পড়া দেন; কিছু না জানলেও দেখেন এটায় কাজ দেয়। এভাবে শুরু করেন যাত্রা। তারপর দিতে দিতে বুঝেন এগুলো ওসব জি'নেরই কা'রামতি। তারা তাকে সাহায্য করছেন, আর তিনিও অনেকের সমস্যার সমাধান করেন।
গত দুই বছর আগে বুঝতে পারেন স্বয়ং তার মেয়েরই জি'নের সমস্যা হয়ে গেছে। সবারটা সারা গেলেও তারটা ঠিক করতে পারছিল না। তারপর ঘুরেন বিভিন্ন কবিরাজ ও নামধারী রাকি’র নিকট। তেমন সমাধান না পেয়ে আসেন আমাদের সেন্টারে। মেয়ের সমস্যা নিয়ে দুইবার আসেন। তখনও তার সমস্যা তেমন শেয়ার করেননি। বাড়ির অন্য সদস্যদের ঝামেলাও অজানা।
তৃতীয় দফা আসে আমার সিরিয়ালে। আপডেট জিজ্ঞেস করে জানি, রুকইয়াহ করে উনার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাকি কিছুই সমাধান হয়নি। জিজ্ঞেস করলাম ধীরে ধীরে বাড়ে বাসায় গিয়ে? হ্যা বলাতে কিছুটা আঁচ করতে পারলাম। মা বলছেন, প্রথমবার জি'নের কান্নার আওয়াজ শুনলেও পরবর্তীতে তার কিছুই হয়নি রুকইয়াহ শুনে। মেয়েকে বাহিরে পাঠিয়ে ভিতরে মায়ের রুকইয়াহ শুরু করি। একটু পর দুলতে থাকে। আঙুল দিয়ে ইশারা করে কিছু একটা দেখাচ্ছিল। বাহিরে মেয়েরও হাল্কা ঘাড় ভার হয়ে আছে।
কিছু সময় পর আমি ধরলাম। কথা শুরু করলে। জি'নের কথা, তারা ভালো জিন। ছোট থাকতেই উনার সাথে থাকেন। তাদের বাসস্থান আজমির শরিফ। সেখানেই জিকির আজকারে মগ্ন থাকে। একজনকে এখানে রেখেছে উনার পরিবারের হেফাজতের জন্য। তারা যাবে না। মৃ'ত্যু ছাড়া কেউ তাদের আলাদা করতে পারবে না। বলছে, রুক'ইয়াহ নাকি কোন ইফেক্ট হয় না। সে মাত্রই আজমির শরিফের আসন থেকে উঠে এসেছে। আমি বললাম, যদি সমস্যাই না হয় তাহলে সামনে আসলি কেন? জবাব নাই। এছাড়াও বিভিন্ন নাসিহা করেও লাভ হলো না। তারপর মেয়ে ও তার রুকইয়াহ একসাথে করি। আধা ঘণ্টায় মেয়ের জি'ন ছেড়ে পালালেও মায়েরটা যাচ্ছে না। ভাবসাব এমন তার কিছুই হয় না।
যেই আমি ধরলাম বিভিন্ন কথা বলা শুরু করে জিনগুলো। বলছে, মহিলা কষ্ট পাচ্ছে। সে স্ট্রোকের রোগী চাপ নিতে পারবে না। তারা চলে গেলে রোগীর ব্যথায় উঠতে পারবে না। কে শুনে কার কথা, আমিও নাছোড়বান্দা। দেখি কোরআনে ইফেক্ট হবে না। পড়তে পড়তে হাপিয়ে গেলে সাথের রাকি ভাইকে ডাকতে পাশের রুমে উঁকি দিতেই ধপাস করে আওয়াজ হলো। ফিরতেই দেখি ছেড়ে পালিয়েছে। কিছুক্ষণ পর সেন্স আসলে বলেন, “আমি এভাবে পরে আছি কেন? আমার কী হয়েছে?” অভয় দিয়ে বসালাম। আরেকটু রুক'ইয়াহ শোনালাম। না, কোন জি'ন নাই আপাতত। সব বুজুর্গ পালিয়েছে।
তারপর উনাকে সবকিছু জিজ্ঞেস করে উপরোক্ত ঘটনা জানতে পারি; যা তিনি অগুরুত্বপূর্ণ দেখে বলেন নাই। অথচ এরজন্য তার মেয়ের চিকিৎসা কতটা বিলম্বিত হতো! বলতে বুঝানোর মতো না। এমন অনেকেই বছরের পর বছর রুকইয়াহ করেও সুস্থ হচ্ছেন না। কারণ একটাই গুরুত্বপূর্ণ, জি'নের গোড়ায় হাত না দিয়ে মাথা বুলানো।
পরিশেষে— এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় হলো, রাকি’র নিকট কোন ঘটনা লুকাবেন না। জিন দিয়ে চিকিৎসা করা হারাম, আদতে সব কবিরাজ নিজেই জি'নের পেশেন্ট। তারা পরবর্তী প্রজন্মের ঘাড়ে এই বিপদ তুলে দিয়ে মৃত্যুবরণ করলেও এই বোঝা বয়ে বেড়ায় তার পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এমন বিপদ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।